একটি উদ্যোগ

কিভাবে পাসপোর্ট করবেন?

  • প্রকাশ: ১০:২১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৯

পাসপোর্ট করার জন্য আমরা প্রায় দালালের শরণার্থী হই এবং তারা মোটা একটা অঙ্কের টাকা নিয়ে যায় আমাদের কাছে থেকে। কিন্তু আজকাল দালালের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন খুব একটা হয় না, যদি আপনি একটু সাহস করে বলে ফেলেন যে আমি নিজে নিজে পাসপোর্ট করবো। কোন দালালের শরণার্থী হবো না। খুব একটা কঠিন কিছু নয়। আমার পাসপোর্ট করার জন্য কি কি করতে হবে, কি করা উচিত নয় এইসব সম্পর্কে কোন ধারণাই আমার ছিল না। আমি গুগলে খুঁজাখুঁজি করে অনেক কিছুই জেনেছি তারপর নিজে নিজেই সব কিছু করে ফেলেছি। এতে করে নিজের ভিতর একটা আত্মবিশ্বাস কাজ করেছে এবং অনেক কিছুই শিখেছি। এখন আপনারা নিজে নিজে করতে হলে কি কি করতে হবে? আজ আমি সেগুলোই ধাপে ধাপে বর্ণনা করবো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তাই লেখাটা বড় হতে পারে। বড় হলেও আশা করি আপনাদের উপকারে আসবে।

১. ফি জমা দেয়াঃ

প্রথমে ফি জমা দিতে হবে। সাধারণ পাসপোর্টের জন্য ৩৪৫০ এবং জরুরী পাসপোর্টের জন্য ৬৯০০ টাকা। টাকা জমা দুইভাবে দেয়া যায়। ১. অনলাইনে এবং ২. ব্যাংকে গিয়ে।
যে ব্যাংক গুলোটে টাকা জমা দেয়া যায়ঃ

  • ওয়ান ব্যাংক
  • ব্যাংক এশিয়া
  • ঢাকা ব্যাংক
  • ট্রাস্ট ব্যাংক
  • সোনালী ব্যাংক
  • প্রিমিয়ার ব্যাংক

আমি ব্যাংক এশিয়াতে দিয়েছিলাম সাধারণের পাসপোর্টের জন্য ৩৪৫০ টাকা।

অনলাইনে জমা দিলে আরো কিছু টাকা বেশী দিতে হবে। ফি জমা দিয়ে ব্যাংক রসিদ রেখে দেবেন। যদি সম্ভব হয় এক কপি ফটোকপি করে নিবেন।

ফি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতেঃ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) ফি (বাংলাদেশ)

২. আবেদন ফরম পূরণ করাঃ

টাকা জমা দেয়া হয়ে গেলে এখন কাজ হচ্ছে আবেদন ফর্ম পূরণ করা। ফর্ম পূরণ দুইভাবে করতে পারেন।

  • ১. ফর্ম ডাউনলোড করে তারপর প্রিন্ট করে পূরণ করা।
  • ২. অনলাইনে পূরণ করে তারপর ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা।

আমার মতে অনলাইনে ফর্ম পূরণ করাটাই ভালো তাহলে সুবিধে হচ্ছে, ভুল হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। আর অফলাইনে করলে দেখা যাচ্ছে ভুল হচ্ছে কারণ যখন আপনি পাসপোর্ট অফিসে যাবেন তখন অপারেটর আপনার ফর্ম দেখে দেখে অনলাইনে পূরণ করবে। তাই ভুল হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই নিজে নিজে অনলাইনে করলে আপনি একবারে যায়গায় কয়েকবার চেক করতে পারবেন।

PASSPORT ONLINE APPLICATION FORM এই লিঙ্কে গেলেই আপনি নিজে নিজে অনলাইনে ফর্ম পূরণ করতে পারবেন। তার আগে নিয়মাবলি ভালোমত পড়ে নিবেন।

ফর্ম পূরণ করার সময় কিছু প্রশ্ন না বুঝতে পারেন। তাই সেগুলো নিয়ে ধারণা দিচ্ছি আপনাকে।

১। পাসপোর্ট টাইপঃ

  • ORDINARY – সাধারণ জনগণের জন্য, কোন সাপোর্টিং ডকুমেন্ট লাগবে না।
  • OFFICIAL – যারা উপযুক্ত তাদের জন্য, GO অথবা PDS জমা দিতে হবে।
  • DIPLOMATIC – ডিপ্লোম্যাটদের জন্য, কোন ডকুমেন্ট লাগবে না।

২। ডেলিভারি টাইপঃ ব্যাংকে যদি ৩৪৫০ টাকা জমা দেন তাহলে REGULAR দিবেন এবং ৬৯০০ টাকা জমা দিলে EXPRESS দিবেন।

ফর্ম পূরণ করার সময় কিছু তথ্য খুব ভালোভাবে দেখেশুনে দিতে হবে। যেমন, নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মার নাম, এন আই ডি নাম্বার। এইসব কোনভাবেই ভুল করা চলবে না, তাহলে ভবিষ্যৎ  এ আপনাকে ঝামেলা পুহাতে হবে। তাই সব থেকে ভালো উপায় হলো সার্টিফিকেট অনুযায়ী দিবেন। এছাড়াও যদি আপনার ডকুমেন্টে কোন ধরণের ভুল থেকে থাকে তাহলে সেগুলো আগে সংশোধন করে নিন তারপর ফর্ম পূরণ করুন।

৩। নামঃ

নামের দুইটা পার্টঃ

First Part(Given Name) এবং Second Part(Surname)। পুরো নামের শেষ অংশটা Surname এ হবে, বাকিটা  Given Name। কারো নামে “মোঃ” থাকলে পুরো MOHAMMAD লেখা লাগবে না, শুধু Md লিখবেন, ডট দেবেন না। কোনরকম শিক্ষাগত ডিগ্রী নামের আগেপিছে লিখবেন না।

৪। বয়স ১৫ বছরের নিচে হলে Guardian অপশন পূরণ করতে হবে। না হলে নরমালি বাবা-মা এর অপশন থাকবে।

৫। বার্থ সার্টিফিকেট বা এনআইডির যেকোন একটি ব্যবহার করলেই হবে।

৬। উচ্চতা ইঞ্চিতে জানলে ইঞ্চিতেই লিখবেন অটো সেঃমিঃ হয়ে যাবে।

৭। বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা একি হলে একি দিবেন তাহলে পুলিশ ভেরিফিকেশন তারাতারি হবে এবং অযতা পুলিশকেও টাকা দিতে হবে না। আর আলাদা হলে আলাদা দিবেন। কারেন্ট বিলে যেভাবে ঠিকানা লেখা সেভাবে লিখলে ভালো হয়। যদিও পুলিশ খুব বাসায় আসেনা। তারা ফোন করে আপনাকে একটা জায়গায় যেতে বলবে সেখানে গেলেই হবে।

৮। জরুরী যোগাযোগের জন্য এমন কাউকে দেবেন যাকে সবসময় পাওয়া যাবে।

৯। ব্যাংকের পেমেন্ট অপশনে ব্যাংকের রসিদ নম্বর দিতে হবে।

সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে পূরণ হয়ে গেলে ফরম সাবমিট করবেন এবং পিডিএফ ডাউনলোড করে নিবেন।

ফরম সাবমিট করার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বায়োমেট্রিকের জন্য যাবেন, নাহলে ফর্মটা অটোমেটিক সার্ভার থেকে ডিলিট হয়ে যাবে। তখন আবার পূরণ করতে হবে।

এছাড়া ফর্ম কিভাবে পূরণ করবেন তার নমুনা দেখে নিতে পারেন। ফর্ম পূরণ কিভাবে করবেন তার নমুনা

৩. ফর্ম প্রিন্টঃ

আবেদন ফর্মটি চার পৃষ্ঠার। প্রিন্টের সময় আলাদা আলাদা চার পেইজ প্রিন্ট না করে ২ পেইজে এপিঠ ওপিঠ করে মোট ২ কপি প্রিন্ট করবেন। প্রিন্ট করার পর কিছু জিনিস হাতে লিখতে হবে।

১. ১ম পৃষ্ঠার ১নং পয়েন্টে আপনার নাম বাংলায় লিখতে হবে।

২. ৩য় পৃষ্ঠার ২৪নং পয়েন্টে ফর্মের সাথে যেসব ডকুমেন্ট দিচ্ছেন ঐ ঘরগুলোতে টিকচিহ্ন দিতে হবে।

৩. ৩য় পৃষ্ঠার অঙ্গীকার নামা অংশে তারিখ ও আপনার স্বাক্ষর দিবেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিবাবকের স্বাক্ষর বা টিপসই দিতে হবে।

পাসপোর্ট সাইজের দুইকপি ছবি দুই ফর্মের নির্ধারিত যায়গায় আঠা দিয়ে লাগাবেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে আবেদনকারীর পিতা-মাতার ছবিও নির্ধারিত যায়গায় আঠা দিয়ে লাগাতে হবে।

৪. সত্যায়িত করাঃ

১. ছবি আঠা দিয়ে লাগানোর পর ছবির উপর সত্যায়িত করতে হবে।

২. ফর্মের ৪র্থ পৃষ্ঠায় প্রত্যয়ন অংশে সত্যায়িত করতে হবে।

৩. বার্থ সার্টিফিকেট বা এনআইডির যেকোন একটি দুইকপি ফটোকপি করে সত্যায়িত করবেন।

৪। পেশা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ড্রাইভার এবং অন্যান্য কারিগরি হলে পেশাগত সনদপত্রের ১ কপি ফটোকপি সত্যায়িত করবেন।

যে সকল ব্যক্তিগণ পাসপোর্টের আবেদনপত্র ও ছবি প্রত্যায়ন ও সত্যায়ন করতে পারবেন – সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও কাউন্সিলরগণ, গেজেটেড কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও পৌর কাউন্সিলরগণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, নোটারী পাবলিক ও আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জাতীয় বেতন স্কেলের ৭ম ও তদুর্ধ্ব গ্রেডের গ্রেডের কর্মকর্তাগণ।

৪. ফর্ম জমাদান ও বায়োমেট্রিকঃ

১. ব্যাংকের রসিদটি প্রথম ফর্মের উপরে আঠা দিয়ে লাগিয়ে নিবেন। এমনভাবে লাগাবেন যাতে ছবি এবং বারকোডের কোন ক্ষতি না হয়।

২. ২ কপি পূরণকৃত কমপ্লিট ফরম, বার্থ সার্টিফিকেট বা এনআইডির যেকোন একটি দুইকপি ফটোকপি করে সত্যায়িত, সত্যায়িত পেশাগত সনদ ১ কপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), GO/PDS/NOC অরিজিনাল কপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) তারপর একসাথে পিন-আপ করে পাসপোর্ট অফিসের অনলাইন কাউন্টারে জমা দেবেন।

৩. ফর্ম জমা দেয়ার পর বায়োমেট্রিক করবেন।

৪. সাদা রঙের কোন পোষাক পরে যাবেননা।

৫. বায়োমেট্রিক হয়ে গেলে আপনাকে একটা টোকেন দেবে। ওই টোকেন দিয়েই পরবর্তীতে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। আপনার ফর্মে যদি কোন ভুল থাকে তাহলে কাউন্টারে যোগাযোগ করুন।

৫. পুলিশ ভেরিফিকেশনঃ

বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এক হলে সাধারণত ভেরিফিকেশন তাড়াতাড়ি হয়। পুলিশ আপনার দেয়া ঠিকানায় আসতে পারে নাও পারে। যদি না আসে তাহলে থানায় ডাকবে হয় আপনাকে নাহলে জরুরী যোগাযোগের জন্য যাকে দিয়েছেন তাকে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওরা শুধুমাত্র আপনার ঠিকানাটা ভেরিফাই করবে।

পুলিশ ভেরিফিকেশনে এমনিতে কোন টাকা লাগে না। ্তারপরেও মাঝে মাঝে পুলিশ ইনডিরেক্টলি টাকা চায় বা আমরা নিজেরাই দেই যাতে করে তারাতারি পাসপোর্টটা হয়ে যায়। যেমন আমাকে বলেছিল বাবা-মা কিছু দিয়েছে কিনা। বাবা-মা বলার কারণ আমাকে উনি ছোট ছেলে মনে করেছিল। :3 উত্তরে আমি বলেছিলাম না আমাকে দেইনি। আর আমি জানতাম না কিছু দিতে হয় তাই সাথে করেও নিয়ে আসিনি। তারপর আমাকে বললো ঠিকাচ্ছে। তবে আমার পাসপোর্ট পেতে প্রায় দেড় মাস লেগেছে। এতোদিন কেন লেগেছে তা জানি না। পুলিশকে টাকা না দেয়ার জন্য লেট হয়েছে কিনা এটাও শিওর না কারণ অনেকে টাকা দিয়েও দুই মাস পর পাসপোর্ট পায়।

৬. পাসপোর্ট সংগ্রহঃ

সাধারণত পাসপোর্ট হয়ে গেলে আপনার দেয়া মোবাইল নাম্বারে মেসেজ আসবে। যদি না আসে অনলাইনে অথবা মেসেজের মাধ্যমে পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা চেক করতে পারবেন।

উচ্চপদস্থ কোন কর্মকর্তা, আর্মি অফিসার, পাসপোর্ট অফিসের চেনাজানা লোক থাকলে আরো দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

পাসপোর্ট রেডি হলে পাসপোর্ট অফিসে টোকেন জমা দিলেই পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন।

এছাড়া কারো কোন প্রশ্ন থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি আমার পক্ষ থেকে যতটুকু পারি সাহায্য করবো।

Your email address will not be published. Required fields are marked *